নতুন জঙ্গি সংগঠনের সামরিক প্রধান এবং বোমা বিশেষজ্ঞ গ্রেফতার

নতুন জঙ্গি সংগঠনের সামরিক প্রধান এবং বোমা বিশেষজ্ঞ গ্রেফতার
ছবি: সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা : নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার অন্যতম শূরা সদস্য ও সামরিক শাখার প্রধান মাসুকুর রহমান ওরফে রনবীর ওরফে মাসুদ (৪৪)। যিনি ২০০৭ সালের আগে চাকরি করতেন পোস্ট অফিসে।
একপর্যায়ে জড়িয়ে পড়েন ডাকাতিতে। ডাকাতি মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান।
সেখানেই জেএমবি সদস্যদের সংস্পর্শে এসে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হন।
জেল থেকে বেরিয়ে জেএমবির সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন।
২০১৭ সালে জামাতুল আনসারের শূরা সদস্য এবং অর্থ ও মিডিয়া শাখার প্রধান রাকিবের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে নতুন সংগঠনটিতে যুক্ত হন। একপর্যায়ে সংগঠনটির সমারিক শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

সোমবার (২৩ জানুয়ারি) ভোরে র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা, র‌্যাব-২, র‌্যাব-৩ এবং র‌্যাব-১৫ এর যৌথ অভিযানে কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন গহীন বন থেকে সংগঠনের বোমা বিশেষজ্ঞ আবুল বাশার মৃধা ওরফে আলম (৪৪)-সহ তাকে গ্রেফতার করে।
এ সময় তাদের কাছ থেকে ১টি বিদেশি পিস্তল, ৩ টি ম্যাগাজিন, ১০ রাউন্ড গুলি, ২টি একনলা বন্দুক, ১১টি ১২ বোরের কার্তুজ, ১০০ রাউন্ড পয়েন্ট ২২ বোরের গুলি, ১টি মোবাইল, নগদ আড়াই লাখেরও বেশি টাকা এবং পার্বত্য অঞ্চলে সামরিক প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর ভিডিও কন্টেন্ট জব্দ করা হয়।
মঙ্গলবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার ৩৮ জন বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া ২০২১ সাল থেকে এই সংগঠনকে সহায়তা এবং সামরিক প্রশিক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কেএনএফের ১৪ জন নেতা ও সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার থেকে সংগঠনটির সামরিক শাখার প্রধধানসহ দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়।
পোস্ট অফিসের চাকরি থেকে রনবীর নতুন জঙ্গি সংগঠনের সমারিক শাখার প্রধান হয়ে ওঠেন উল্লেখ করে এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, তিনি ২০০৭ সালের আগে পোস্ট অফিসে চাকরি করতেন। একপর্যায়ে চাকরির পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ডাকাতিও করতেন। ডাকাতির মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলে পরিচয় হয় জেএমবি সদস্যদের সঙ্গে।
জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন সময় কারাগারে থাকা জেএমবি সদস্য ও তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন রনবীর। ২০১৭ সালে জামাতুল আনসারের শূরা সদস্য রাকিবের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসেবে জামাতুল আনসারে যোগ দেন।
রনবীর সিলেট অঞ্চলে সংগঠনের দাওয়াতি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমসহ সামরিক শাখার সদস্য নির্বাচন কার্যক্রম তত্বাবধান করতেন। ২০২১ সালে পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রশিক্ষণ সেন্টারের সঙ্গে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার চুক্তিপত্র স্বাক্ষরকালীন বৈঠকে রনবীরসহ অন্যান্য শূরা সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে গ্রেফতারকৃত রনবীর পাহাড়ে সামরিক প্রশিক্ষণের রূপরেখা নির্ধারণ করেন।
কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে সিলেট থেকে ৪ তরুণের নিখোঁজের ঘটনায় রনবীর জড়িত ছিলেন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শেষে নিখোঁজ ওই ৪ তরুণকে তিনি সামরিক শাখায় নিযুক্ত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রায় ১ বছর আগে সংগঠনের সামরিক শাখা প্রধানের দায়িত্ব নেন।
তার সামরিক কার্যক্রমের দুটি শাখা ছিল, যার একটি পাহাড়ে এবং অপরটি সমতলে। সমতলে সামরিক শাখার কার্যক্রম তার নেতৃত্বে পরিচালিত হতো। তিনি দেশব্যাপী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত সদস্যদের সামরিক সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ও সামরিক শাখার সদস্য নির্বাচন কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করতেন।
গ্রেফতার আবুল বাশার মৃধা প্রসঙ্গে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, হাটহাজারীতে মাদরাসায় লেখাপড়ার পর আরেকটি মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। নিখোঁজ ৫৫ জনের তালিকায় আবুল বাশারেরও নাম আছে। তিনি দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হুজির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। হুজিতে থাকাকালে ঝালকাঠিতে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের জন্য একটি মামলায় ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন বছর কারাভোগ করেন।
২০১৬-১৭ সালের দিকে আমির মাহমুদের মাধ্যমে জামাতুল আনসারে যোগ দেন। পাহাড়ে প্রশিক্ষণের জন্য ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বাড়ি ছাড়েন এবং ২ মাস সমতলের বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণ নেন। পরে রনবীর ও রাকিবের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিতে পার্বত্য অঞ্চলে যান। আমির মাহমুদ আইইডিসহ বিভিন্ন ধরনের বোমা তৈরিতে দক্ষ, এ বিষয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। জামাতুল আনসারের পাহাড়ে প্রশিক্ষণার্থীদের তিনি বিভিন্ন ধরনের বোমা তৈরি বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিতেন।
রনবীরের মোবাইলে থেকে একটি ভিডিও উদ্ধার করা হয়েছে উল্লেখ করে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, তাাতে ২০২১ সাল থেকে ২২ এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের ফুটেজ রয়েছে। প্রশিক্ষণকালে তাদের নানা শারিরীক কসরত, শত্রুর ক্যম্পে হানা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, এ সময় কার অবস্থান কী হবে, কীভাবে দলগতভাবে চলতে হবে এসব নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
ফুটেজে সামরিক প্রধানের নেতৃত্বে কারসে ও চাম্পাইয়ের নেতৃত্বে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। ভিডিওটি প্রথমত, ম্যুরাল বুস্টআপের জন্য তৈরি করা হয়েছে। যখনই সংগঠনের সামরিক শাখায় কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে তখন তাকে এটি উদ্বুদ্ধ করার জন্য দেখানোর সিদ্ধান্ত হয়। তাদের এমন আরও ভিডিও তৈরির কার্যক্রম চলমান ছিল।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নতুন জঙ্গি সংগঠনটিতে আমির এবং ৬ জন সূরা সদস্য রয়েছে। এদের টার্গেট করে কাজ করছিলাম। যাদের মধ্যে ২-১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে আমিরের বিষয়ে আমরা এখনো তথ্য পাইনি, তাকে খুঁজে পেতে কাজ চলছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত যারা নিখোঁজ তাদের অধিকাংশই প্রশিক্ষণরত বা কেউ প্রশিক্ষণ শেষ করে অন্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। আমাদের অভিযানের কারণে অনেকে দলছুট হয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। তবে কতজন সমতলে এসেছে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত না।
রনবীরের বক্তব্য অনুযায়ী নিখোঁজ ৫৫ জনের অধিকাংশই সামরিক ক্যাম্পে অবস্থান নিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এর আগেও বেশ কয়েকজন প্রশিক্ষণ নিয়েছে।
এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, ভিডিওটি তারা প্রচারণার জন্যই তৈরি করেছিল। তবে এ কার্যক্রম সম্পন্নের আগেই তাকে গ্রেফতার সম্ভব হয়েছে। এখনো কোনো মাধ্যমে ভিডিওটি দেখিনি। তবে হয়তো তাদের প্রস্তুতি ছিল নিজেদের প্রচারের জন্য ভিডিও ব্যবহার করবে।
এখন পর্যন্ত গ্রেফতারদের বক্তব্যে সংগঠনে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের রিক্রুটের তথ্য পাওয়া যায়নি। তারা দেশব্যাপী রিক্রুট করেছে, তাদের রিক্রুট চলমান আছে।
কুকিচিনের প্রধান নাথান বমের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সামরিক শাখার প্রধান রনবীর বলেছে সেপ্টেম্বরের পর থেকে নাথান বমের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই। এখন আমির বা অর্থ শাখার প্রধানকে আমরা গ্রেফতার করতে পারিনি। তাদের যদি খুঁজে পাই এ বিষয়ে জানতে পারব।