পরিবেশবান্ধব বৃক্ষই পারে মানব প্রকৃতির সুরক্ষা দিতে 

পরিবেশবান্ধব বৃক্ষই পারে মানব প্রকৃতির সুরক্ষা দিতে 
ছবিঃ সংগৃহীত

মো. নজরুল ইসলাম।।মানিকগঞ্জ।।সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের ধরনী।ধরনীর প্রাণ সবুজ প্রকৃতির সুবাতাস। মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মা নদী। নিচু এলাকা হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে মাঠে ঘাটে পানিতে থইথই করে। বন্যার সময় পদ্মা নদী ভাঙনে জনগণের জান মালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। হরিরামপুরের চর এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি। কারণ হিসাবে এলাকার সচেতন মানুষ বলেন প্রায় ৩০ বছর আগে আমাদের পদ্মার চরের বেশ খানিকটা জেগেছিলো। তারই প্রেক্ষিতে চরে মানুষের বসতি গড়ে উঠে। সুন্দরভাবে বেঁচে বাস করতে তারা অল্প কিছু দেশী প্রজাতির গাছপালা রোপণ করে। এই প্রজাতিগুলোর মধ্যে স্বল্প পরিসরে কিছু ফলের ও কাঠের গাছ দেখা যায়। কিন্তু এই এলাকায় খুব কমই দেখা যায় তাল, খেজুর ও বট-পাকুড় গাছ। হরিরামপুর পদ্মা তীরবর্তী হওয়ায় নদী ভাঙন এবং বন্যায় রাস্তা-ঘাট ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য স্থানীয় সাধারন মানুষ ও যুবকদের সহযোগিতায় তাল ও খেজুর বীজ বপনের উদ্যোগ গ্রহন করেন।
সরকারিভাবে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে লোকসংগীত আর হাজারী গুড়কে মানিকগঞ্জ জেলার ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে। এমনকি মানিকগঞ্জের লোগোতেও একই বিষয়টিতে অন্তভুক্ত করা হয়েছে- “লোক সংগীত আর হাজারী গুড়, মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর”। ব্র্যাডিং আইটেম হিসাবে হাজারী গুড়ের ব্যাপক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে খেজুর বীজ বপন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ রোপণ ও তাল খেজুর বীজ বপনে হরিরামপুরে কৃষকগণ উদ্যোগী হয়।
 বেসরকারি সংগঠন বারসিকক এর সহযোগীতায় আন্ধারমানিক স্বেচ্ছাসেবক টিম, জলবায়ু স্বেচ্ছাসেবক টিম, পদ্মা পাড়েরর পাঠশালা, কৌড়ি স্বেচ্ছাসেবক টিমের উদ্যোগে ২০১৪ সাল থেকে তাল ও খেজুর বীজ বপন কার্যক্রম শুরু করা হয়। যুবকদের উদ্যোগকে আরো শক্তিশালী করার জন্য সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম চলতে থাকে। তাল ও খেজুর বীজ বপনে কৃষক-কৃষাণি ও গাছি সম্প্রদাায়কে উদ্বুদ্ধকরণে স্কুল, কলেজ ও গ্রাম পর্যায়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে তাল ও খেজুর বীজ বপন করেন। স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্যোগে হরিরামপুরে ১৮ কিলো রাস্তার পাশে তাল খেজুর বীজ বপন করা হয়। বর্তমানে রাস্তার পাশে গেলে দেখা যায় তাল খেজুর গাছগুলো বড় হয়ে উঠছে। তাছাড়াও গ্রাম পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে তথ্য নিয়ে জানা যায় কৃষকগণ প্রায় ২০০০ তাল ও খেজুর বীজ বপন করেন বাড়িতে, রাস্তার পাশে ও জমির আইলে। হরিরামপুর স্বেচ্ছাসেবক টিমের উদ্যোগে তাল খেজুর বীজ বপন করেন চালা বাজার থেকে কামার পাড়া, কৌড়ি কলেজ থেকে সাপাইর বাজার,  লাউতা বাজার থেকে সাপাইর বাজার,  দড়িকান্দি রোড, বাহিরচর রোড, কর্মকারকান্দি রাস্তা, দিয়াবাড়ি বাজার থেকে দুর্গাপুর, হরিনাঘাট থেকে পাটগ্রাম বাজার, খড়িয়া রোড, উত্তর পাটগ্রাম রোড হরিরামপুর।
হরিরামপুর স্বেচ্ছাসেবক টিমের সদস্য সোলাইমান হোসেন বলেন- সমন্বিত উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবক টিম, স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের উদ্যোগে তাল ও খেজুর বীজ সংগ্রহ করা হয়। শুনেছি তাল গাছে ফল ধরতে অনেক সময় লাগে। তবে তাল গাছে ভাজ পড়ে, বাবুই পাখিসহ অন্যান্য প্রাণিরা বাঁচে। এজন্য মানুষ সচেতন হয়ে তাল ও খেজুর বীজ বপন করছেন। হরিরামপুর স্বেচ্ছাসেবক টিমের আহবায়ক শাহীন টিটু বলেন, “খেজুরের গুড় আমাদের ঐতির্যের সাথে মিশে আছে। তাল গাছে বজ্রপাত পড়ে বলেই মানুষসহ অন্যান্য প্রাণি উপর পড়ে না। ফলে জান-মালের ক্ষতি কম হয়। হরিরামপুর পদ্মা পাড়ের পাঠশালা পরিচালক মীর নাদিম হোসেন বলেন- বিগত যে কোন সময়ের চেয়ে বর্তমানে বজ্রপাত বেশী হয়। বজ্রপাত রোধে, রাস্তা ঘাট ভাঙ্গন রোধে তাল ও খেজুর বীজ বপন আমাদের সমন্বিত উদ্যোগ। এই উদ্যোগে বারসিক পাশে থেকে সহযোগিতা করছেন। আমাদের বৃক্ষ রোপন উদ্যোগ চলতে থাকবে। স্বেচ্ছাসেবকদের পাশে থেকে বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা এবং উদ্বুদ্ধ করেছেন বিগত সময়ের মানিকগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক মো. নাজমুস সাদত সেলিম, হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুবিনা ফেরদৌসি ও কাজী আরেফিন রেজওয়ান উপজেলা কৃষি অফিসার মোহাম্মদ জহিরুল, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবুল বাশার সবুজ। বর্তমানে কর্মরত হরিরামপুর উপজেলা চেয়ারম্যান দেওয়ান সাইদুর রহমান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম, কৃষি অফিসার আব্দুল গফারসহ অন্যান্য কর্মকর্তাগণ। বৃক্ষ রোপনে উদ্যোগী ব্যক্তিগণ সাথে থেকে বারসিকে সহযোগিতা করছেন।
স্বেচ্ছাসেবক টিমের উদ্যোগে ৭ বছর আগে রাস্তার পাশে তাল ও খেজুর বীজ বপনকৃত বীজ চারা হয়ে ৫ ফিট পর্যন্ত বড় হয়েছে।   এলাকার জনগণই সমন্বয় করে তাল ও খেজুর চারাগুলো সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। তাল ও খেজুর বীজ বপনে যেসকল লোকজন অংশগ্রহন করেন তারাই পরিচর্যা করছেন। পাটগ্রাম চরের কৃষাণি আজিনা বেগম বলেন, “চর এলাকায় তাল ও খেজুর গাছ নেই। রাস্তার পাশে তাল ও খেজুর বীজ উৎসাহ নিয়ে বপন করেছি। এখন রাস্তার পাশে তাকালেই দেখা যায় তাল ও খেজুর গাছ বড় হয়ে উঠছে। আমাদের কাছে দেখতে ভালো লাগে। বাহিরচরের কৃষক শহিদ বিশ্বাস (৫০) বলেন, বর্তমানে বৃক্ষ রোপনে মানুষের উৎসাহ ও উদ্যোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বড় তাল ও খেজুর বড় গাছ কমে গেছে, তবে রাস্তার পাশে স্বেচ্ছাসেবক টিমের উদ্যোগে বপনকৃত বীজ চারা হয়ে বড় হচ্ছে। বারসিক স্বেচ্ছাসেবক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে রাস্তার পাশে তাল খেজুর বীজ বপন করে পরিবেশবান্ধব কাজ করছে। এক সময় রাস্তার পাশে খুব সুন্দর দেখা যাবে। আমরা আমাদের এলাকা থেকে তাল এবং খেজুর রস ও গুড় তৈরি করে খেতে পারব। বাড়ি বাড়ি ফলজ ঔষধী, বনজ গাছের চারা দিয়ে ও পারিবারিক নার্সারী তৈরিতে সহযোগিতা করে আসছে। পাখিরা বাস করবে, কৃষকের ফসল রক্ষা হবে। আমরা সবাই মিলে সবুজ পৃথিবীতে ভালো থাকব। লোকসংগীত আর হাজারী গুড়কে মানিকগঞ্জ জেলার ব্র্যান্ডি করা হয়েছে। আমাদের সমন্বিত উদ্যোগ সমাজ ও দেশের উন্নয়নে সহায়ক হবে।
াসরকারিভাবে আমাদের প্রাণের জেলাকে যে উপমায় ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে সেটি যতার্থই হয়েছে। এখন আমরা কথা ও কাজে মিল রাখতে চাই। মধ্য সমতল ভূমির আমাদের  মানিকগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যের ধারায় সমুন্নত রাখতে সরকারি বেসরকারি ও সামাজিকভাবে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে চাই। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুকি মোকাবেলায তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে বলতে চাই পরিবেশবান্ধব বৃক্ষই পারে মানব প্রকৃতির সুরক্ষা দিতে।