মৃত্যুর পথযাত্রী ক্যান্সারাক্রান্ত প্রেমিকাকে হাসপাতালে বিয়ে

মৃত্যুর পথযাত্রী ক্যান্সারাক্রান্ত প্রেমিকাকে হাসপাতালে বিয়ে
ছবি: সংগৃহীত

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার, ১৫ মার্চ।। ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালেই শয্যাশায়ী ফাহমিদা। তার জীবন সংকটাপন্ন জেনেও হাল ছাড়েননি টগবগে প্রেমিক যুবক কক্সবাজার জেলার চকরিয়ার হাসান। তাদের মধ্যে সম্পর্কটা ছিল গভীর। 

দুইজনই ভবিষ্যতে যে একসঙ্গে সুখী জীবন কাটানোর জন্য মন বেঁধেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাদের নিখাদ ভালোবাসা, মমত্ববোধ ও মানবিকতা দৃষ্টান্ত। 
প্রেম-ভালোবাসার বহু শ্বাশত কাহিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তেমনি হাসপাতালের বেডে গত ৯ মার্চ রাতে আরেক ভালোবাসার অমর উপাখ্যান রচনা করলো হাসান ও ফাহমিদা।
চকরিয়া উপজেলার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের ছেলে মাহমুদুল হাসান নর্থ সাউথ থেকে এমবিএ শেষ করেছেন।চট্টগ্রাম নগরীর দক্ষিণ বাকলিয়াতে জন্ম নেয়া ফাহমিদা কামাল ইইউবি থেকে বিবিএ ও এমবিএ শেষ করেছেন।
শিক্ষাজীবনে তাদের দুজনের পরিচয়। লাবণ্যময়ী স্মার্ট সুন্দরী তরুণী ফাহমিদাকে ভালো লাগতে শুরু করে হাসানের। এর পর আস্তে আস্তে দুজন প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। ভালোবাসার মায়াবী বন্ধনে হয়ে উঠে দুজন দুজনার। হাতে হাত ধরে স্বপ্নেবিভোর রঙিন ভুবনে উড়তে থাকে অচেনা হাজারো পথে। সুখ আনন্দ সবই যেন ভরপুর। বিয়ে সংসার কত না মধুর সুখ চোখের কোনায়। 
কিন্তু একি! এমন স্বপ্ন সুখের রঙিন উঠোনে ঘনকালো অন্ধকার। সফেদ আকাশ মেঘে ঢাকা বৈরী ঝড়ো হাওয়া সব তছনছ করে দিতে উদ্যত। ফাহমিদার স্বপ্নরাঙা মায়াবী শরীরে বাসা বাঁধে মরণঘাতী ক্যান্সার। ধরা পরার পর সাথে সাথে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা এভারকেয়ার, পরবর্তীতে ভারতের টাটা মেমোরিয়াল হসপিটালে নেয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ একবছর চিকিৎসার পর ডাক্তাররা সাফ জানিয়ে দেয়, ফাহমিদার চিকিৎসা আর সম্ভব নয়, ইঙ্গিত দেয়, পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আর নেই।
পাথরচাপা কষ্ট নিয়ে পরিবারের লোকজন ২০ বছর বয়সী ফাহমিদাকে চট্টগ্রামে নিয়ে এসে মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করান। সেখানে চলতে থাকে চিকিৎসা। কিন্তু ক্রমাগত ফাহমিদার শারীরিক অবস্থার অবনতির দিজে যাচ্ছিল। 
প্রেয়সী ফাহমিদার অসহ্য কষ্ট ও বুকভাঙা যন্ত্রণা প্রেমিক হাসানের সহ্য হয় না। ফাহমিদার কষ্ট হাসান ভাগ করে নিতে চায়। চোখের জল মুছে দিতে চায়, কপালে হাত রেখে বলতে চায়, আমি আগের মতো এখনো তোমার পাশে আছি। হাতে হাত রেখে বলতে চায়, আমি তোমাকে বড্ড ভালোবাসি। তুমিই আমার জীবন তুমিই আমার সব। মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াতে চায়। বুকে জড়িয়ে নিয়ে কষ্টগুলো নিজের করে নিতে চায়। কিন্তু তা কী করে সম্ভব! হাসান ফাহমিদার প্রেমিক হলেও সমাজের চোখে পরপুরুষ। মৃত্যুযন্ত্রণায় ফাহমিদা নিঃশেষ হতে চলেছে দিনদিন। তার জীবন প্রদীপ প্রায়ই শেষের দিকে।
এবার হাসান কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। ফাহমিদাকে যদি মরতে হয়, তাহলে তার বুকে মাথা রেখেই মরতে হবে। নিজের পরিবারকে নিয়ে এসে প্রস্তাব দিলো সে, ফাহমিদাকে বিয়ে করতে চায়। মৃত্যু পথযাত্রী ফাহমিদাকে হাসানের বিয়ে করার প্রস্তাবে সবাই হতবিহ্বল। হাসানকে বুঝানোর সব ধরনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু হাসান তার সিদ্ধান্তে অটল।

অবশেষে উভয় পরিবার সম্মত হয়। বিষয়টি জানানো হয় জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা ফাহমিদাকে। অবিশ্বাস্য প্রস্তাব শুনে অপলক তাকিয়ে থাকে সে প্রিয় হাসানের দিকে। ফাহমিদার মুখে ফুটে উঠে নির্মল স্বর্গীয় হাসি। আনন্দ অশ্রুতে দুজনের পৃথিবী দোল খেতে থাকে। বাতাসে নাচতে থাকে রঙিন প্রজাপতি।

অবশেষে বিয়ের প্রস্তুতি নেয়া হয়। গত ৯ মার্চ রাতে চট্টগ্রাম  মেডিকেল সেন্টারে তাদের বিয়ের আয়োজন করা হয়। কনে ফাহমিদাকে পরানো হয় লাল বেনারসি শাড়ি, গলায় সোনার হার। বর হাসানকে পরানো হয় পায়জামা-পাঞ্জাবি। আক্দ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। দুজন মিলে কেক কাটে, মালা বদল হয়। খেজুর মিষ্টি খাওয়ানো হয়।

ক্ষণিকের জন্য মরণঘাতী ক্যান্সারকে জয় করে ফাহমিদা হয়ে উঠে অন্য এক পৃথিবীর বাসিন্দা। সমস্ত স্বর্গীয় সুখ তাকে ঘিরে রাখে। হারিয়ে যাওয়া সোনালি দিনগুলো আবার যেন ফিরে পায়। আনন্দে আত্মহারা ফাহমিদার আরো বাঁচতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে হাসানের বুকে মাথা রেখে হাজার বছর বাঁচতে।
হাসান আর ফাহমিদার এই অমর প্রেমকাব্যে প্রেমেরই জয় হলো। জীবন ক্ষনিকের, জীবনের কাছে প্রেম অবিনশ্বর।
এ ক্ষেত্রে অসাধারণ ও বিরল কাজটি করে দেখিয়েছে চকরিয়ার সন্তান মাহমুদুল হাসান। নারীরা নানাভাবে অবহেলিত। কিন্তু হাসানের একটি অনন্য কাজ সমাজের সব মানুষের মাঝে দাগ কেটেছে।

হাসান চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালীর সাবেক চেয়ারম্যান আজিজুল হকের বড় ছেলে। 
গত কয়েকদিন তাদের বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। অসাধারণ ছবি। ছবিগুলোই কথা বলছিল। হাসপাতালের বেডে বসে হাসানের পাশে অসুস্থ ফাহমিদা। অমলিন হাসি ফাহমিদার। নতুন করে বেঁচে থাকার আশা জাগায়। হাসানের এই মহত্ত্ব ও মানবিকতায় গর্ববোধ করছে পুরো কক্সবাজারবাসী। সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই পারেন ফাহমিদার হাসি অটুট রাখতে। ফাহমিদা আমাদের কাছে সুস্থ ও একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে ফিরে আসুক এ কামনা সবার।