রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিত স্বপ্ন যাত্রা : সংসার পাততে নারীদের সাগর পাড়ি

রোহিঙ্গাদের অনিশ্চিত স্বপ্ন যাত্রা : সংসার পাততে নারীদের সাগর পাড়ি
ছবি: সংগৃহীত

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার, ১২ মে।। রোহিঙ্গা পাচারের হার দিনদিন বাড়ছে। ক্যাম্পগুলোতে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ, খুনোখুনি, ইয়াবা ব্যবসা, অভাব অনটনসহ নানান কারনে তারা নিজেরাও বের হতে চায় ক্যাম্প থেকে। চায় একটি সুন্দর জীবন। কিন্তু ক্যাম্প থেকে দালালদের প্ররোচনায় নিরুদ্দেশভাবে সাগর পথ পাড়ি দিতে গিয়ে সম্মুখীন হতে হচ্ছে অনিশ্চিত জীবনের। কেউ কেউ বোট ডুবে মারা যায় সাগরেই, কেউ দালালদের অত্যাচারে। আবার কাউকে কাউকে কয়েকদিন সাগরে ঘুরিয়ে নামিয়ে দেয়া হয় কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপকূলে। প্রতারিত হয়ে তারা আটক হন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে।

আবার এসব রোহিঙ্গাদের কেউ লক্ষ্য স্থানে পৌঁছালেও সেখানে গিয়েও পড়তে হয় হাজারো বিপদে। আবার সেই বিপদ পার হয়ে গেলেও তারা নিজেরাই বাংলাদেশী পরিচয়ে জড়িয়ে পড়ে অপরাধে। সেই অপরাধের দায়ভার নিতে হয় বাংলাদেশকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোহিঙ্গা পাচারের ঘটনায় নিজেরাই বেশি জড়িয়ে পড়ছে। সাথে আছে স্থানীয় দালাল চক্র। যারা রোহিঙ্গা শরনার্থী  ক্যাম্পের দালাল চক্রের সঙ্গে মিলে মিশে নারী ও শিশুদেরকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে। এই কাজে ভালো পারদর্শীতা দেখাতে পারে রোহিঙ্গা দালালরা। যাদের কাজ হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ফুঁসলিয়ে স্থানীয় দালালদের হাতে তুলে দেয়া। এর পর সোজা সাগর পথে অনিশ্চিত স্বপ্ন যাত্রা। খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে,শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে শীত মৌসুমে সাগর থাকে শান্ত।
প্রায় প্রতি মাসে বঙ্গোপসাগরের কোন না কোন পয়েন্ট দিয়ে মাছ ধরার নৌকা, বোট বোঝাই  করে  লোক পাঠানো হচ্ছে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্য। যদিও মাস দুয়েক আগে এই যাত্রা হতো প্রতিদিন। সমুদ্র  পথকে সহজ  ভেবে  রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নানা  কৌশলে রোহিঙ্গাদের সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দিচ্ছে চক্রটি। কক্সবাজার জেলার টেকনাফ ও উখিয়ার ৩৪ রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পের প্রতিটি ক্যাম্পে ওই চক্রের সদস্যরা ছদ্মবেশে আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানা গেছে।
সুত্রে জানা যায়, মিয়ানমারের নাগরিক ওমর আকবর। উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পের বাসিন্দা। নিয়ম অনুযায়ী ওমরের ক্যাম্পের বাইরে যাবার কথা নয়। বাস্তবতা হলো ওমর (৫১) ক্যাম্পে বসবাস করেন না। থাকেন টেকনাফ উপজেলার  বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া গ্রামের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে।
ওমরের ছেলে রশিদ মিয়া (২৮) থাকেন বাবার সাথে। পিতা পুত্র দু’জনই মানবপাচারে অভিযুক্ত। ওমর কিংবা রশিদ নয়। এই ধরনের মিয়ানমারের বাসিন্দা ইউনুছ (২৯), বাদশা মিয়া (২৯) বশর কিংবা উখিয়া বালুখালি ক্যাম্পের সৈয়দ হোসেনের মতো অনেক রোহিঙ্গা মানব পাচারে জড়িত। এরা প্রত্যেকে মানব পাচার মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। তারা ক্যাম্প কেন্দ্রীক মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের সাথে জড়িত।
বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের তালিকাভূক্ত মানবপাচারকারী শফি উল্লাহর ছেলে শহিদ উল্লাহ, তার ভাই মালয়েশিয়া ফেরত আরিফ উল্লাহ সিন্ডিকেট মানবপাচারে জড়িত বলে একাধিক সুত্রে জানা গেছে। শফি উল্লাহর ছেলে তৈয়ব উল্লাহ,নুর উল্লাহ, করিম উল্লাহ,ইবরাহীম মালেশিয়ায় আদম পাচারে গত ৬/৭ বছর ধরে জড়িত। শফি উল্লাহর রয়েছে দুটি মানবপাচারের মামলা, একাধিক বার জেলও খেটেছে। মানবপাচার করে বর্তমানে কোটি টাকার মালিক। শহিদ উল্লাহর রয়েছে দুটি ইঞ্জিনের বোট। ওই বোট দিয়ে শামলাপুর নৌকার ঘাট দিয়ে ট্রলারে রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের কৌশলে লোভে ফেলে বোটে তোলেন।পরে নির্যাতন করে টাকা আদায় করে বলে সুত্রে জানায়। রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে লোকজন সংগ্রহ করে কৌশলে তা পাচার করে এই সিন্ডিকেট।
রোহিঙ্গা শরনার্থী 
ক্যাম্প ঘিরে বাঙালি আর রোহিঙ্গা মিলে গড়ে তুলেছে মানব পাচার সিন্ডিকেট। কেউ অর্থের লোভে আবার কেউ স্বপ্নের মানুষের সাথে সংসার পাততে মালেশিয়ায় যেতে দিচ্ছে অথৈ সাগর পাড়ি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা উত্তাল সাগর পাড়ি দিচ্ছে তাদের অধিকাংশ রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষ। লোভে পড়ে মাঝে মাঝে ঝুঁকি নিচ্ছে বাংলাদেশীরাও।
এতে অনেকের সলিল সমাধি হচ্ছে মাঝ সাগরে, আবার অনেকে হয়তো পৌঁছে যাচ্ছে স্বপ্নের মালেশিয়ায়। সর্বশেষ গত ১১ এপ্রিল মানবপাচারে অভিযুক্ত থাকার অপরাধে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এর আগে গত ৫ এপ্রিল উখিয়া উপজেলা সদর এলাকা থেকে নারী ও শিশুসহ ৪৮ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।
উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ  (ওসি) আহমেদ সঞ্জুর মোরশেদ জানান, পাচারের উদ্দেশে টেকনাফ থেকে কক্সবাজারের দিকে রোহিঙ্গাদের বহনকারি একটি বাস আসার খবর পেয়ে উখিয়া সদরে একটি তল্লাশি চৌকি বসানো হয়। বাসটি পৌঁছালে ১৭ নারী, ২২জন পুরুষ, ছয়জন মেয়ে শিশু ও তিনজন ছেলে শিশুকে উদ্ধার করা হয়।
গত ২৫ মার্চ ভোররাতে বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর উপকূলের গভীর সাগরে অভিযান চালিয়ে ৩৫ নারী-শিশুসহ ৫৮ জন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে র‌্যাব। মানবপাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে এ সময় দুইজনকে আটক করে। জব্দ করা হয় একটি ট্রলার।
র‌্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল খাইরুল ইসলাম সরকার জানান, ট্রলারের ডেকের নিচে ‘বিশেষ কায়দায় জিম্মি’ করে রাখা অবস্থায় রোহিঙ্গা নারী পুরুষদের উদ্ধার করা হয়। এদের মধ্যে একজন স্থানীয় ব্যক্তিও রয়েছে। আটক করা হয় দুই পাচারকারীকে। উদ্ধার রোহিঙ্গারা র‌্যাবকে জানিয়েছে, মালেশিয়ায় উচ্চ বেতনে বিভিন্ন পেশায় চাকরি করতে যাচ্ছিলো তারা।
স্থানীয় দালালের মাধ্যমে জনপ্রতি ৫৫ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়। প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার টাকা করে দালালকে দেয়। বাকি টাকা বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থানকারি পচারকারি চক্রের জাহাজে উঠার পর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আদায়ের কথা ছিল।
এব্যাপারে র‌্যাব-১৫ এর এসআই আবু ছায়েদ বাদী হয়ে উখিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় গ্রেপ্তার সোহেল ও মুছা কলিমুল্লাহ ছাড়া আরো চারজনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন, বোটের মালিক বাহাদুর, পুতিয়া, জাকির, ও নুরে আলম।
গত ২১ মার্চ মহেশখালী সোনাদিয়া দ্বীপ থেকে ১৩৫ জন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে পুলিশ। এদের মধ্যে ৫৭ জন নারী,বাকিরা পুরুষ ও শিশু। তাদেরকে মালেশিয়া নেয়ার কথা বলে কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপে নামিয়ে দেয় পাচারকারী চক্র।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ আশপাশের এলাকা থেকে ৪৪৩ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে পুলিশ। গত ৪ মে বুধবার ঈদের দ্বিতীয় দিনে তাঁদের আটক করা হয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, সৈকতে বেড়ানোর জন্য উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা বের হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা বেশি। তাঁরা শিবিরের বাইরে আসতে হলে যে অনুমতি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে, তা ভঙ্গ করেছেন। সে জন্য তাঁদের আটক করা হচ্ছে। কেউ কেউ বলেছে, তারা সুযোগ বুুঝে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিতে সৈকতে জড়ো হয়েছিল। 
প্রসংত, ২০১০ সালের দিকে সর্বপ্রথম কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকা দিয়ে সাগর পথে মালেশিয়ায় মানবপাচার শুরু হয়। ২০১২ সালের পর থেকে মানব পাচারের প্রবণতা বেড়ে যায়।
পরে টেকনাফ ছাড়াও জেলার মহেশখালী, কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, রামু ও পেকুয়ার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রাতের আঁধারে সাগর পথে মানবপাচারের ঘটনা বেড়ে যায়।
মানব পাচার রোধে ২০১৪ সালে ৮টি সুপারিশের কথা জানিয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি। কমিটি ১১ জন আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী, ২৩০ জন বাংলাদেশি পাচারকারী ও সাতজন হুন্ডি ব্যবসায়ী চিহ্নিত করা হয়েছিল।
চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান বর্তমানে পিবিআই’র (পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন) ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারের নেতৃত্বে উক্ত তদন্ত কমিটির তিন সদস্য ছিলেন, চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (সদর) নিয়াজ মোহাম্মদ, নগর বিশেষ শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাইমুল হাছান ও কক্সবাজারের তৎসময়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহম্মেদ।
এরপর ৮ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু কমিটির দেয়া ৮ সুপারিশ আজও আালোর মুখ দেখেনি।