রোমান্টিক সাহিত্যের ইতিকথা - তৌহিদুল ইসলাম

রোমান্টিক সাহিত্যের ইতিকথা - তৌহিদুল ইসলাম

রোমান্টিক গদ্য কিংবা কবিতা আমাদের সকলের কাছেই উপভোগ্য। রোমান্টিক লেখকেরা পাঠকের মনের কোণে আলাদা একটি জায়গা করে নিয়ে থাকেন। রোমান্টিসিজম বা কল্পনাবিলাসী লেখার সেই লেখক যখন কোন রোমান্টিক লেখা লেখেন তখন তার মধ্য বাস্তবতা ও কল্পনার সংমিশ্রণজাত অনুভূতি বিরাজ করে যার প্রতিফলিত রুপ প্রকাশ পায় উক্ত লেখায়। বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিসিজমকে লেখকগণ এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে হতে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত ইউরোপীয় সাহিত্যে, বিশেষত ইংরেজি, জার্মান ও ফরাসি সাহিত্যে যে একটা নবসৃষ্টির জোয়ার এসেছিলো; তার স্বরূপ ব্যক্ত করবার জন্যই একে রোমান্টিক আখ্যায় অবহিত করা হয়েছে। রোমান্সের প্রকৃত অর্থ সমুন্নত কল্পনার বিলাস। গদ্যময় দৃষ্টিভঙ্গির উপর অবাধ কল্পনার রশ্মি নিক্ষেপ। এই সাহিত্য সৃষ্টিতে মূলত দিব্য ভাব-কল্পনার মায়াঞ্জন সাহায্যে প্রকৃতি ও মানবজীবনের অন্তর্লোকে প্রবেশ করে নিত্য সৌন্দর্য উদঘাটন করবার প্রয়াস আছে বলেই একে রোমান্টিক হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে।

রোমান্টিসিজম একটা বিশিষ্ট সাহিত্যরস-একটা মানস-দৃষ্টিভঙ্গি। আলৌকিক সৌন্দর্যানুভূতি ও অফুরন্ত বিস্ময়ের উপলব্ধিই রোমান্টিক সাহিত্য সৃষ্টির মর্মকথা। বাইরের সংস্কারকে আমরা গ্রহণ করি প্রধানত বুদ্ধি ও অনুভূতির সাহায্যে। এই বাস্তব, সাধারণ বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপের মধ্যে রোমান্টিক কবি দেখেন এক অসাধারণ ব্যঞ্জনা। অতিরিক্ত একটা অত্যাশ্চর্য প্রকাশ, বৈশিষ্ট্যহীনের মধ্যে এক অপূর্ব তাৎপর্য।

রোমান্টিক সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হলো- অনুভূতির তীব্রতা ও গভীরত্ব। কল্পনার অবাধ প্রসার, একটা ভাবগত অখন্ড সৌন্দর্যের জন্য অদম্য কৌতূহল ও নব নব অভিযান এবং জগতের গূঢ় আবেদনে সদাজাগ্রত চিত্তবৃত্তি। পৃথিবীর তরুলতা, নদী-পর্বত হতে আরম্ভ করে সামান্য ধূলিকণা পর্যন্ত এক মহান সৌন্দর্য ও গৌরবে পরিব্যপ্ত হয়ে আছে বলে রোমান্টিক কবিগণ অনুভব করেন। প্রাচীন ইতিহাসের কিংবদন্তী ও রূপকথার কল্পনাবিলাস তাঁদের কাব্যে আসন গেড়ে নিয়েছে। লেখকদের রোমান্টিসিজম নিয়ে লেখার এই নবসৃষ্টির দ্বারা সাহিত্য যেন এক নতুন রাজ্যে জয় করেছে।

প্রকৃতি ও মানব জীবনের শত-সহস্র প্রকাশের মধ্যে রোমান্টিক কবি অনুভব করেন এক অপার্থিব সৌন্দর্য। আপাতদৃষ্টিতে যেটি নিতান্ত সাধারণ, গদ্যময়, সংসারের কুশ্রীতা, মলিনতায় ঢাকা। তারমধ্যেই আবিষ্কৃত হয় একটা অসাধারণত্ব, সৌন্দর্য ও রহস্যময়তা। ক্ষুদ্র, তুচ্ছ জিনিস কবির চোখে ধরা দেয় অপরূপ তাৎপর্য ও সুষমামণ্ডিতরুপে। ক্ষুদ্র একটি গাছের পাতা, ছোট্ট একটা পাখির ডাক, সূর্যাস্তের একটু রক্তিম আভা লেখকের কাছে অনন্ত বিস্ময়ের খনি। এ যেন সাধারণ দৃষ্টির অতীত এক নূতন সৌন্দর্যের লীলাভূমি।

মানুষকেও রোমান্টিক কবি দেখেন অ-সাধারণ চোখে। মানুষের মধ্যে আছে পরম বিস্ময়, অনন্ত সম্ভাবনীয়তা ও রক্তমাংসের অতীত এক সত্ত্বা। মানব জীবনের এই বৃহত্তর ও মহত্ত্বর অংশকে রোমান্টিক কবি দেখেছেন পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে। লেখকের এই ঊর্ধ্বতম সত্ত্বায় মানুষে-মানুষে কোনো প্রভেদ নেই। মানুষের এই অংশ চিরস্বাধীন, চিরমুক্ত; আকাশের মতো যার ব্যপ্তি। নর-নারীর সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, উত্থান-পতন, স্নেহ-প্রেমকে তাঁরা দেখেছেন গভীর তাৎপর্যের সঙ্গে। রোমান্টিক সাহিত্যে নিরর্থকের অর্থ হয়েছে আবিষ্কৃত, ক্ষুদ্রকে উন্নীত করা হয়েছে বৃহতের ভূমিকায়। রোমান্টিক সাহিত্যে লেখকগণ প্রকৃতি ও মানব জীবনকে এক অপার্থিব সৌন্দর্য, গৌরব ও মহত্ত্বে মন্ডিত করেছেন।

রোমান্টিক সাহিত্য-সৃষ্টি পাঠে ভাবলোকের মধ্যে প্রাণের নবতম স্পন্দন অনুভব করা যায়। এমন অপূর্ব সম্পদ লাভ করা যায় যাতে ধরণীর শতগ্লানি, শতদুঃখ-জ্বালার মধ্যেও এ সংসার মধুময় লাগে। মানুষের প্রাণে এক অনন্ত সান্তনা নেমে আসে। মনে হয়, এই শোক-জ্বালাময় মানবজীবন উদ্দেশ্যবিহীন নয়। মানুষের স্নেহ-প্রেম নিরর্থক নয়, ক্ষণিকের নয়। সমস্ত সাহিত্যসৃষ্টির যে নিত্যবস্তু তারই চরমতম প্রকাশ ঘটে রোমান্টিক সাহিত্যকলায়।

যুগের পরিবর্তন হয়, রুচিরও পরিবর্তন হয়। কিন্তু মানুষের অন্তরতম সত্ত্বার কোনো পরিবর্তন হয় না। নিত্যকালের রোমান্টিক সাহিত্য যা চিরন্তন রস-পিপাসার অফুরন্ত সুধা-নির্ঝর কল্পনাবিলাসীতায় ভরপুর। ঠিক এ কারনেই বেশিরভাগ পাঠক রোমান্টিক সাহিত্যপাঠে সুখানুভূতি লাভ করেন।

আর তাইতো কল্পনাবিলাসী সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন-

“এ গলিতে বাস মোর, তবুও আমি জন্মরোমান্টিক

আমি সেই পথের পথিক

যে পথ দেখায়ে চলে দক্ষিণে বাতাসে

পাখির ইশারা যায় যে পথের অলক্ষ্য আকাশে।

আকাশ-কুসুম- কুঞ্জবনে

দিগঙ্গনে

ভিত্তিহীন যে বাসা আমার

সেখানেই পলাতকা আসা-যাওয়া করে বারবার।”

তৌহিদুল ইসলাম 

লেখক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।