লোমর্হষক রায়হান হত্যার সাড়ে ৬ মাস পর আসছে চার্জশিট

লোমর্হষক রায়হান হত্যার সাড়ে ৬ মাস পর আসছে চার্জশিট
ছবিঃ সংগৃহীত

সিলেট অফিস।। ২৭ এপ্রিল, মংগলবার।। গত বছরের ১০ অক্টোবর দিন পেরিয়ে ভোর রাতের দিকে সিলেট নগরীর কাষ্টঘর স্যুইপার কলোনী থেকে রায়হান আহমদ নামের এক যুবককে বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে যায় ইনচার্জ এসআই আকবর ও তার সহকারীরা। কয়েকঘন্টা চলে পাশবিক নির্যাতন। পরে ১১ অক্টোবর ভোরে রায়হানের নিথর দেহ হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত ঘোষণা করে পুলিশ।
পরদিন ১২ অক্টোবর নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে ১৩ অক্টোবর পুলিশ হেড কোয়ার্টারের নির্দেশে এ মামলার তদন্তের দায়িত্ব নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
আইন অনুযায়ী ১২০ দিনের ভিতর মামলার চার্জশিট প্রদানের কথা থাকলেও দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস অতিক্রম হলেও এখনো এ মামলার চার্জশিট দিতে পারেনি রাষ্ট্রীয় এই তদন্ত সংস্থাটি। এর ভেতর কয়েক দফায় সময় বাড়ানো হলেও চলতি মাসের ভিতরেই চার্জশিট দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিলেটের পুলিশ সুপার খালেদুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘আমাদের তদন্ত শেষ। কিছু টেকনিক্যাল বিষয় বাকি থাকায় আমরা এগুলো শেষ বারের মতো যাচাইবাছাই করছি। এ মাসের ভিতরেই চার্জশিট দেওয়া হবে।’
এদিকে ১২০ দিনের ভিতর চার্জশিট দিতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আইন বিজ্ঞরা। সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম বলেন, দণ্ডবিধি অনুযায়ী ১২০ দিনের ভিতর চার্জশিট দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে চার্জশিট দিতে না পারায় আমরা হতবাক। কারণ আমরা মনে করেছিলাম পিবিআই একটি পরিক্ষিত ইউনিট। সে ক্ষেত্রে তারা নির্ধারিত সময়ে চার্জশিট দিতে না পারা হতাশার।’
অপরদিকে চাঞ্চল্যকর এ মামলার চার্জশিটের জন্য সিলেটের মানুষ অধির আগ্রহে অপেক্ষা করলেও কয়ে দফায় বাড়ানো হয়েছে সময়। এমনকি কবে এ মামলার চার্জশিট কবে দেওয়া হবে কিংবা কতজনকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে সে বিষয়টি নিয়েও আছে মানুষের ব্যাপক আগ্রহ। তাছাড়া ঘটনার পর নির্যাতনের দৃশ্য ধারণ করা সিসিটিভির হার্ডডিস্ক গায়েব করে লাপাত্তা হয়ে যাওয়া নোমানকেও এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এমন অবস্থায় নোমানকে চার্জশিটে অভিযুক্ত করা হবে কি না তা নিয়েও আছে প্রশ্ন।
এমন অবস্থায় সন্দিহান নিহত রায়হান আহমদের মা সালমা বেগম। তিনি বলেন, ‘সবাইকে গ্রেপ্তার করা হলো, কিন্তু নোমানকে এখনো গ্রেপ্তার করা হলো না কেন তা নিয়ে আমি সন্দিহান। নোমান যে কোথায় পালাল তার তথ্য এখন বের করতে পারলো না পিবিআই। তাকে ধরতে তাদের এতো গাফিলতি কেন এটা আমি বুঝে উঠতে পারছি না।’
তবে নোমানের ব্যাপারে এখনই কিছু বলতে পারছে না পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তারা বলছে, ‘চার্জশিট না দেওয়া পর্যন্ত এখনই নোমানের ব্যাপারে কিছু জানানো যাচ্ছে না। কিংবা এ মামলার চার্জশিটে কতজনকে অভিযুক্ত করা হবে সে ব্যাপারেও কিছু আপাতত জানানো যাচ্ছে না।’
এদিকে চার্জশিট দিতে সময়ক্ষেপণের কারণে হতাশ সালমা বেগম আছেন শংকায়। তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ আন চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ততক্ষণ কিছুই বুঝতে পারছি না। এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ করে করে পিবিআই কেবল সময় নিচ্ছে। তাদের সাথে যোগাযোগ করলেই বলে এই সপ্তাহে হয়ে যাবে, আগামী সপ্তাহে হয়ে যাবে। কিন্তু তারা চার্জশিট দিচ্ছে না।’
তবে চার্জশিট দিতে বিলম্বের কারণ হিসেবে আকবরের মোবাইল থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঠিক যাচাই বাছাইয়ের বিষয় উল্লেখ করছেন পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার খালেদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আকবরের মোবাইল থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এখন কেবল এগুলোর একটু যাচাইবাছাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি কয়েকজন সাক্ষী যাচাই বাছাইয়ের প্রয়োজন ছিলো। আর করোনার কারণেও কিছু বিলম্ব হয়েছে। তবে সকল কিছু শেষ আশা করছি এ মাসেই চার্জশিট দেওয়া হবে।’
রায়হান হত্যাকাণ্ডের পরদিন ১২ অক্টোবর তার স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নী বাদী হয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করলে তদন্তের প্রেক্ষিতে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ৯ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রশাসন। এখন পর্যন্ত ৫ পুলিশ সদস্যসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা সবাই কারাগারে আছেন। গ্রেপ্তার ৬ জন হলেন- বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, টুআইসি এসআই হাসান আলী, এএসআই আশেক ই এলাহী, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও ওইদিন ছিনতাইয়ের অভিযোগকারী একজন। তাছাড়া বরখাস্ত অবস্থায় এসআই আব্দুল বাতেন ভুঁইয়া, এএসআই কুতুব আলী ও প্রত্যাহার অবস্থায় কনস্টেবল মো. সজীব হোসেনকে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।
অপরদিকে এ হত্যা মামলার অনেক অগ্রগতি এবং চার্জশিট প্রদান সময়ের ব্যপার হলেও আকবরকে পালাতে সহায়তাকারী কথিত সাংবাদিক নোমানকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
এর আগে গত ১১ অক্টোবর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে গুরুতর আহত হন রায়হান নামের ওই যুবক। তাকে ওইদিন সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে গুরুতর আহত অবস্থায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন বন্দরবাজার ফাঁড়ির এএসআই আশেক ই এলাহীসহ পুলিশ সদস্যরা। সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান রায়হান।
ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, নগরের কাস্টঘরে গণপিটুনিতে রায়হান নিহত হন। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় ফাঁড়িতে পুলিশি নির্যাতনে প্রাণ হারান রায়হান।
যদিও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু নিরোধ আইনকে মূল ধরেই মামলার কার্যক্রম চলছে বলে বলে জানালেন পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার খালেদুজ্জামান। চার্জশিটের ব্যাপারে পরবর্তীতে প্রেস কনফারেন্স করে সকল তথ্য জানানো হবে বলে জানালেন তিনি।
তবে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু নিরোধ আইনে যথেষ্ট ফাঁক থাকায় অপরাধীরা সুবিধা পেতে পারে। এজন্য পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু নিরোধ আইনের পাশাপাশি দণ্ডবিধি যুক্ত করার ব্যাপারে তাগিদ দিলেন সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম।