সুইসাইড ট্রি: যে গাছের স্পর্শে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় মানুষ!

সুইসাইড ট্রি: যে গাছের স্পর্শে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় মানুষ!
ছবিঃ আজকাল বাংলা

তৌহিদুল ইসলাম।।স্টাফ রিপোর্টার।।অদ্ভুত শোনালেও পৃথিবীতে সুইসাইড ট্রি নামের এমন এক গাছের অস্তিত্ব আছে যার স্পর্শ মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। একারণে একে “সুইসাইড ট্রি” বা “আত্মহত্যার গাছ” নামে ডাকা হয়। যদিও গাছটি লবণাক্ত উপকুলীয় জলাভূমির কিন্তু খোদ রংপুরেই এই গাছ দেখে কিঞ্চিত অবাক হয়েছি। কারন এমন লবণাক্ত আবহাওয়া রংপুরের নয়। 

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের পূর্বদিকের যে জায়গাটি পার্কের মোড় নামে পরিচিত সেখান থেকে কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট সড়ক ধরে মাহিগঞ্জ সাতমাথার দিকে কিছুদুর যেতেই চোখে পড়বে সুইসাইড ট্রি। 

প্রথম দেখায় অচেনা মনে হওয়ায় স্থানীয় মানুষদের এই গাছ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকি। স্থানীয় জনগণের অনেকেই গাছটিকে বিষগাছ, অচীন গাছ, সুইসাইড ট্রি নামেই ডাকে। জনশ্রুতি আছে, এই মহাসড়ক তৈরীর কোন একসময় চায়না থেকে কাজ করতে আসাদের মধ্যে কেউ এই গাছটি এখানে রোপণ করেছিলো। (অসমর্থিত সূত্র)

এই গাছটি প্রাকৃতিকভাবেই দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে জন্মায়। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে কেরালার উপকূলীয় অঞ্চলেই এই গাছটি সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। সাধারণত, লবণাক্ত জলাজমিতে এটি ভাল জন্মায়। উপকূলীয় লবণাক্ত জলাভূমিতেও এই গাছের দেখা পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশেই এটা কৃত্রিমভাবে জন্মানো হয়েছে। ঈষৎ গুল্ম জাতীয় এই গাছটির ফল হয় অনেকটা আমের মত দেখতে। 

গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Cerbera odollam. তবে বিভিন্ন অঞ্চলে গাছটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমনঃ ভারতের কেরালাতে এর নাম “ওথালাঙ্গা মারাম”, তামিলনাড়ুতে এর নাম “কাট্টু আড়ালি”। মাদাগাস্কারে এটি আবার “ফামেন্তানা”, “কিসোপো”, “সামান্টা” এবং “ট্যাংগেনা” নামে পরিচিত। শ্রীলংকায় একে “পং-পং”, “বিন্তারো” কিংবা “নয়ন” নামে ডাকা হয়। সিংহলিজ ভাষায় এর নাম “গন কাদরু”।

সুইসাইড ট্রি কিভাবে মানুষকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে?

আসলে, Cerbera odollam প্রচন্ড বিষাক্ত একপ্রকার গাছ। গাছটির সারা গায়ে এক প্রকার বিষাক্ত হুল রয়েছে। এই হুলে “কার্ডেনোলাইড” এবং “কার্ডিয়াক গ্লাইকোসাইড” নামক বিষাক্ত টক্সিন রয়েছে যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে হৃদপেশীর কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ফলে অনিয়মিত হৃদস্পন্দন শুরু হয়।

এছাড়াও গাছটিতে এক ধরণের নিওরোটোক্সিন রয়েছে যা মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে সারা শরীরে প্রচন্ড যন্ত্রণার এক অনুভূতির জন্ম দেয়। আর এই যন্ত্রণা প্রায় দুই বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এই গাছের হুল গায়ে লাগলে সরাসরি সেভাবে মানুষ মারা যায় না। তবে দীর্ঘসময় যাবৎ ভয়াবহ অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য মানুষ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়।

এই গাছের বিষের তেমন কার্যকরী এন্টিডোট আবিষ্কৃত হয়নি। ঠিক এই কারণেই গাছটির এই নাম। তবে, হুল তুলে আক্রান্ত স্থানে মোমের উপর হাইড্রোক্লোরিক এসিড লাগালে বিষের প্রভাব কিছুটা কমে।

Cerbera odollam যে শুধুমাত্র যন্ত্রণা প্রদানকারী গাছ তা নয়। অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। এই গাছের রস থেকে বায়োডিজেল তৈরী করা যায়, যা জ্বালানী হিসেবে ডিজেলের পরিবর্তে ব্যাবহৃত হতে পারে। তাছাড়া কীটপতঙ্গ তাড়ানোর জন্য কীটনাশক তৈরীতেও এর ভূমিকা রয়েছে।

Cerbera odollam এর মত বিষাক্ত এবং যন্ত্রণাদায়ক গাছ আর পৃথিবীতে খুব সম্ভবত নেই। অন্য যেকোন বিষের তুলনায় দশগুণ যন্ত্রণা দিতে পারে এই ভয়ংকর গাছটি। শুধুমাত্র কেরালাতেই ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫৫০ এরও বেশি মানুষ এই গাছের বিষে আক্রান্ত হয়েছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রংপুর সিভিল সার্জন এর কার্যালয় থেকেও নাকি কোন একসময় এই গাছটি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিলো। তবে এমন একটি গাছের পাশে কোন প্রকার গাছ সচেতনতা ও পরিচিতিমূলক সাইনবোর্ড নেই। কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করছি।

[নোট - Cerbera odollam ছাড়াও আরও এক ধরণের সুইসাইড ট্রি রয়েছে পৃথিবীতে।   Tachigali versicolor নামের এই গাছটিকে অবশ্য সুইসাইড ট্রি বলা হয় অন্য কারণে। জীবনে মাত্র একবার ফুল দেয় Cerbera odollam. আর ফুল দেয়ার পরপরই গাছটি আপনা থেকেই মারা যায়। একারণে একেও সুইসাইড ট্রি বলা যায়।