স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়ে কতটুকু হয়েছে স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণ !

স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়ে কতটুকু হয়েছে স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণ !

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মূহুর্তকে স্মরণ করার জন্য প্রতিবছর ২৬শে মার্চ  পালিত হয় স্বাধীনতা দিবস। গণতন্ত্রের দাবি ও ন্যায়ের স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে (কাল রাত) তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তাানের জনগণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু করে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের আত্মদান, ৩ লাখ নারীর সম্ভ্রম আর বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় বিজয়। পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের। স্বাধীনতা দিবস এলে আমরা কত শত সভা সেমিনারে কত বড় বড় বুলি ছাড়ি,  স্বাধীনতা দিবসকে পুঁজি করে বিভিন্ন অফারে ব্যবসার  প্রসার ঘটাই কিন্তু সত্যিকারে কতটুকুইবা আমরা একজন মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের খোঁজ নিচ্ছি, অসহায়দের সহযোগিতা করছি এই স্বাধীনতা দিবসে।
আচ্ছা বাদ দিলাম সে কথা। ১৯৪৭ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত¡ ও দেশ বিভাগের অখন্ড বাংলার দ্বিখন্ডিত করণ তথা হিন্দু-মুসলমানদের আলাদা ভূখন্ডে পরিবর্তনের নির্দয় করুণ পরাজয়ের কলঙ্ক বয়ে বয়ে বাঙালীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা।
কিন্তু ৭১ এ যখন এ স্বাধীনতার বীজ অঙ্কুরিত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্ঠে উচ্চারিত হয়েছিলো, " আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো, মনে রাখবা এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম",  তখন অনেকে ভাবছিলো এটা দুই মুসলমানকে আলাদা করার জন্য ভারতের একটা ষড়যন্ত্র। আর এ ভাবনা থেকেই বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিপরীতে পশ্চিম পাকিদের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই বিপক্ষের অধিকাংশই ২৫ মার্চ রাতে পাকি নরপিচাশদের কুৎসিত ভয়ঙ্কর হত্যা ও ধ্বংসের তান্ডবলীলা দেখে তাদের ভুল বুঝতে পেরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে চলে যায় এবং কিছু রয়ে যায় পাকিদের পক্ষে।
অবশেষে নয় মাস রক্তস্নাত যুদ্ধে লক্ষ প্রাণ, নারীর ইজ্জত, কিশোরীর ছিন্ন ভিন্ন রক্তাক্ত কাপড়, এলো মেলো চুল, গোলাপী ওষ্ঠ যুগলে কালো ছাপ, বুকে বিষাক্ত হায়েনাদের নিষ্ঠুর দাঁতের অসংখ্য দাগ সমেত এক নদী রক্ত কলঙ্কের বিনিময়ে পেয়েছি এ স্বাধীনতা।
এত কষ্টের বিনিময়ে স্বাধীনতা উপভোগের প্রত্যাশায় যে স্বাধীনতা আমরা কিনেছিলাম,  তা কী আমরা পেয়েছি?  পাইনি। বেশিদিন যেতে হয়নি, স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই আমাদের সেই স্বাধীনতার প্রত্যাশার সোনালী আভা হতাশার আঁধারে নিমজ্জিত হতে থাকলো। 
যার ফলশ্রæতিতে, মেধা ও যোগ্যতার জোরে চাকরীর স্বাধীনতা আজ আটকে গেছে অর্থের বেড়াজালে, তারুণ্যের প্রতিভাকে সমাজের কল্যানে নিয়োজিত করার স্বাধীনতা ডুবে গেছে মাদকের ভূবনে, আমাদের ফ্যাশন বিনোদন ও সংস্কৃতির স্বাধীনতা পাল্টে গেছে চটুল সংগীত আর অর্ধনগ্ন আইটেম গার্লদের উদ্দাম নৃত্যে আধুনিকতার দোহাই দিয়ে। সু-শাসনের পরিবর্তে অর্থের বদৌলতে পাল্টে যায় বিচারের রায়, শান্ত ছেলেটির পকেটে পুলিশের গুঁজে দেয়া ইয়াবায় নিরীহ ছেলেটিও হয়ে যায় অপরাধী। সত্যিই কি আমরা এমন স্বাধীনতা চেয়েছিলাম! 
নারী আজ দেশ প্রধান হয়েও স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও আমরা কী নারী অধিকার, নারীর সঠিক নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হয়েছি?  আজও নারী যৌতুকের যাতাকলে পিষ্ট হচ্ছে, এখনও সে ধর্ষিত হচ্ছে এখানে সেখানে, ধর্ষনের  ভয়ে কেঁপে ওঠে বার বার প্রতিটি পদক্ষেপে। নিজ ব্যবসা চালাতে, নিজের জমিতে নিজের টাকায় বাড়ী করতে মেটাতে হয় শকুনের অনাকাঙ্খিত অর্থ ক্ষুধা। তখন  মনে হয় এটা আমার দেশ নয়, আমার স্বাধীনতা নেই, আমি যেন সাইবেরিয়ার অতিথি পাখি। হাসপাতালে দিতে হয় অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা বিল। এসব দেখার সময় আমাদের নেই কিন্তু আমরা আঙ্গুল তুলি শুধু ডাক্তারের ফি,  শিক্ষকদের কোচিং আর সাংবাদিকদের খবরের উপরে।
আমরা সমাজতন্ত্র না মানলেও, সমাজতন্ত্রের মূল যে কথা- নির্যাতিত মানুষের পক্ষে কথা বলা  এটা সবাই আমরা মানি। কিন্তু সেটা মুখে,  দিন শেষে আমরা নির্যাতনকারীর পক্ষেই কথা বলি। দুই দল রেষারেষি করে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের অবস্থান করে দেই। আমরা এ শঙ্কাময় জীবন নিয়ে আর কত স্বাধীনতার গান গাইবো। সত্যি বলতে স্বাধীনতা আজ লটকে আছে  লোক দেখানো ব্যানার, ফেস্টুন আর সভা সেমিনারে।
এসব দেখে অন্তর  থেকে শুধু একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে। আজ স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়েও আমাদের  ভাবতে হয়, গণতন্ত্রের দাবি ও ন্যায্য অধিকারের  যে স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম তার কতটুকু স্বপ্ন পূরন হলো,  আমাদের সত্যিকারের স্বাধীনতা পেতে আর কতইবা আপেক্ষা করতে হবে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে না পারলে দুঃস্বপ্নই রয়ে যাবে রক্তদামে কেনা আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন।


লেখক: জহিরুল ইসলাম রাসেল                                                    গণমাধ্যম কর্মী।